Income Tax

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যে সকল নাগরিক বছরে দুই লাখ বিশ হাজার টাকা বা তার বেশি আয় করেন তাদেরকে অবশ্যই কর দিতে হবে। প্রত্যেক কর দাতার নির্দিষ্ট একটি “টিন (TIN)” নাম্বার রয়েছে। কর প্রদান ও গ্রহণের বিষয়টি সহজ ও সুন্দরভাবে করার জন্য ১০ অঙ্কের এই টিন নাম্বার প্রদান করা হয়। এত দিন টিআইএনের পুরো প্রক্রিয়া কাগুজে নথিভিত্তিক ছিল। আয়কর দেওয়া নিয়ে করদাতাদের ভোগান্তির অবসান এবং নথি সংরক্ষণব্যবস্থা সরল করার লক্ষ্যে থেকে ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা ‘ই-টিআইএন’ ব্যবস্থা চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর ফলে এখন আর রাজস্ব টিন নাম্বারের অফিসে জন্য যেতে হবে না। ঘরে বসেই টিন নম্বর এর জন্য নিবন্ধন করা যাবে। জরুরী প্রয়োজনে যেকোনো স্থান থেকে টিন সনদ প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করতে পারবেন। অত্যাধুনিক পদ্ধতির ডিজিটাল সিকিউরিটি থাকায় টিআইএন জাল করা যাবে না। বন্ধ হবে ভুয়া টিআইএন ব্যবহার করে নানা অপকর্মের সুযোগ। সব নিবন্ধনকারীর তথ্য ডেটাবেইজে সংরক্ষিত থাকায় একদিকে স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে টিআইএন ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে করদাতারা পাবেন সহজ সেবা।

আয়কর রিটার্ন কি?

আয়কর কর্তৃপক্ষের নিকট একজন করদাতার বার্ষিক আয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করার মাধ্যম হচ্ছে আয়কর রিটার্ন। আয়কর রিটার্ন ফরম এর কাঠামো আয়কর বিধি দ্বারা নির্দিষ্ট করা আছে। আয়কর আইন অনুযায়ী রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়।

আয়কর রিটার্ন কারা দেবেন?

কোন ব্যক্তি (individual) করদাতার আয় যদি বছরে ২,৫০,০০০/- টাকার বেশী হয় তবে তাকে রিটার্ন দিতে হবে। মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সের পুরুষ করদাতার আয় যদি বছরে ৩,০০,০০০/- টাকার বেশি, প্রতিবন্ধী করদাতার আয় যদি বছরে ৩,৭৫,০০০/- টাকার বেশী এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে ৪,২৫,০০০/- টাকার বেশী হয় তাহলে তাঁকে রিটার্ন দিতে হবে। তবে আয়ের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন কতিপয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তাঁদের তালিকা নীচে দেয়া হলোঃ

(১)    আয়বর্ষে করযোগ্য আয় থাকলে;

(২)    আয়বর্ষের পূর্ববতী তিন বছরের যে কোন বছর করযোগ্য আয় নিরূপিত হলে;

(৩)    সিটি কর্পোরেশন অথবা বিভাগীয় ও জেলা শহরের পৌরসভায় বসবাসকারীদেরঃ

ক) একটি গাড়ীর মালিক হলে;

খ) মূল সংযোজন কর আইনে নিবন্ধিত কোন ক্লাবের সদস্য হলে;

(৪) সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা অথবা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স এবং ব্যাংক এ্যাকাউন্ড থাকলে;

(৫) ডাক্তার, দন্ত চিকিসৎক, আইনজীবী, আয়কর আইনজীবী, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট এ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ার অথবা সমজাতীয় পেশায় নিয়োজিত সকল ব্যক্তিবর্গ;

(৬) চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অথবা কোন ট্রেড এসোসিয়েশনের সকল সদস্য;

(৭) পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল পদপ্রার্থী;

(৮) সরকারী; আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা অথবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ঠিকাদারী কাজে টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান;

রিটার্ন ফরম কোথায় পাওয়া যায়

সকল আয়কর অফিসে রিটার্ন ফরম পাওয়া যায়। একজন করদাতা সারা বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আয়কর অফিস থেকে রিটার্ন সংগ্রহ করতে পারেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েব সাইটে www.nbr-bd.org থেকেও রিটার্ন download করা যায়। রিটার্নের ফটোকপিও গ্রহণযোগ্য।
রিটার্ন দাখিলের সময়

ব্যক্তি-করদাতাকে ট্যাক্স ডে (কর দিবস) এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। ২০১৬-২০১৭ কর বছরের জন্য ৩০ নভেম্ভর ২০১৬ তারিখ হচ্ছে কর দিবস, অর্থাৎ রিটার্ন দাখিলের সর্বশেষ তারিখ। একজন ব্যক্তি-করদাতা ১ জুলাই ২০১৬ থেকে ৩০ নভেম্ভর ২০১৬ তারিখের মধ্যে ২০১৬-২০১৭ কর বছরের রিটার্ন দাখিল করবেন।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব না হলে একজন করদাতা রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে উপ কর কমিশনারের কাছে সময়ের আবেদন করতে পারেন। সময় মঞ্জুর হলে বর্ধিত সময়ে মধ্যে সাধারণ অথবা সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতি আওতায় রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব।

রিটার্ন কোথায় দাখিল করতে হবে?

প্রত্যেক শ্রেণীর করদাতার রিটার্ন দাখিলের জন্য আয়কর সার্কেল নির্দিষ্ট করা আছে। যেমনঃ A, B এবং C অক্ষরগুলো দিয়ে ঢাকা সিভিল জেলায় অবস্থিত যে সকল বেসামরিক সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারী ও পেনশনভূক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীর নাম শুরু হয়েছে তাঁদেরকে কর অঞ্চল-৪, ঢাকা এর কর সার্কেল-৭১ এ রিটার্ন জমা দিতে হবে। পুরোনো করদাতারা তাঁদের সার্কেলে রিটার্ন জমা দেবেন। নতুন করদাতারা তাঁদের নাম, চাকুরীস্থল বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানার ভিত্তিতে নির্ধারিত সার্কেলে ১২ সংখ্যার ই-টিআইএন (e-TIN) উল্লেখ করে আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন। করদাতারা প্রয়োজনে কাছাকাছি আয়কর অফিস বা কর পরামর্শ কেন্দ্র থেকে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সার্কেল সম্পর্কে জানতে পারবেন।

প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত মেলায় করদাতাগণ আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। রিটার্ন দাখিলের সময় করদাতা বিদেশে অবস্থান করলে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসেও রিটার্ন দাখিল করা যায়।

রিটার্ন দাখিল না করলে কি হয়?

কোন করদাতা আয়কর অধ্যাদেশের ৭৫ ধারানুসারে নিধারিত সময়মত আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা করার বিধান রয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪ ধারা অনুযায়ী জরিমানা, ৭৩ ধারা অনুযায়ী বিলম্ব সুদ আরোপযোগ্য হবে। যে ক্ষেেএ করে উপ কর কমিশনার কাছে সময়ের আবেদন করে সময় মঞ্জুর হলে বর্ধিত সময়ে মধ্যে রিটার্ন দাখিল করবেন, সে ক্ষেত্রে করদাতার উপর জরিমানা আরপিত হবেনা, তবে অতিরিক্ত সুদ ও বিলম্ব সুদ আরপিত হবে।
আয়কর রিটার্নের প্রকারভেদ

ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতা ও কোম্পানী করদাতাদের জন্য পৃথক পৃথক রির্টান ফরম চালু আছে। যথাঃ-

#  ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতার জন্য রিটার্ন ফরমঃ

আইটি-১১গঃ

এ ফরম বাংলা ও ইংরেজী উভয় ভাষায় চালু আছে। সকল ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতা এ ফরমটি ব্যবহার করতে পারবেন।

আইটি-১১ঙঃ

রিটার্ন ফরমটি (IT-11-UMA) কেবল বেতনভোগী করদাতাদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।

আইটি-১১চঃ

যে সকল ব্যক্তি করদাতার ব্যবসা বা পেশাখাতে আয় রয়েছে এবং এরূপ আয়ের পরিমান ৩ লক্ষ টাকার বেশী নয় সে সকল করদাতার জন্য এই আয়কর রিটার্ন ফরম (IT-11-CHA) প্রণয়ন করা হয়েছে।

#  স্পট এ্যাসেসমেন্ট এর আওতাধীন করদাতাদের জন্য ভিন্ন রিটার্ন ফরমঃ

রিটার্ন ফরমটি (IT-GAGA) কেবলমাত্র স্পট এ্যাসেসমেন্ট এর আওতাধীন ব্যবসা এবং ডাক্তার ও আইন পেশায় নিয়োজিত তুলনামূলক কম আয়ের নতুন করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য। ব্যবসার ক্ষেত্রে যাদের ব্যবসার পুঁজি সর্বোচ্চ ১৫ লক্ষ টাকা এবং ডাক্তার বা আইনজীবী যারা অনধিক ১০ বছর তাদের পেশায় নিয়োজিত আছেন তাঁরা দুই পৃষ্ঠার ফরমটি স্পট এ্যাসেসমেন্ট ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন;

# কোম্পানী করদাতার জন্য রিটার্ন ফরমঃ ইংরেজী ভাষায় এ ফরমটি চালু আছে।