নতুন নিয়োগ শুল্ক গোয়েন্দায় আসছে তিন হাজার শুল্ক গোয়েন্দা

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে আধুনিক এবং শক্তিশালী করতে প্রায় ৩ হাজার জনবল নিয়োগ দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)।

একই সঙ্গে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হেলিকপ্টার, ফরেনসিক ল্যাব, উচ্চ প্রযুক্তির গোয়েন্দা সামগ্রী ও নৌযানসহ অন্যান্য লজিস্টিকস সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে শুল্ক গোয়েন্দা থেকে নতুন কাঠামোসহ এক গুচ্ছ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান স্বাক্ষরিত প্রস্তাবনাটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বরাবর পাঠানো হয়েছে। যা বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রাইজিংবিডিকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রস্তাবনা সূত্রে জানা যায়, নতুন সাংগঠনিক কাঠামোতে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরাপত্তাসহ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে ৩ হাজার ১৬৮ জনবল, ২টি হেলিকপ্টার, ৫টি নৌযান, ফরেনসিক ল্যাব, উচ্চ প্রযুক্তির গোয়েন্দা সামগ্রীসহ অন্যান্য লজিস্টিকস ও অফিস যন্ত্রপাতির চাহিদা অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি রোধে র‌্যাব ও বিজিবির মতোই দেশজুড়ে অভিযান চালাতে সক্ষম হবে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির জনবল কাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাংগঠনিক কাঠামোতে সদর দপ্তরের বাইরে শুল্ক গোয়েন্দার ঢাকা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীন ১২ সার্কেল এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ২১ সার্কেলে কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ১৬৮ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিদ্যমান লোকবলের বিষয়ে শুল্ক ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাঠামোতে বর্তমানে মোট ৩৩৪ জন জনবল নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান জনবল মাত্র ১৮৪ জন। এর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আছেন সর্বসাকুল্যে ৬৪ জন। অথচ দেশের বিস্তৃত সীমান্ত ও বন্দর এলাকার তুলনায় এ জনবল কাঠামো একেবারেই অপ্রতুল। এ ছাড়া এ অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে মহাপরিচালকসহ আরো কয়েকটি পদের মর্যাদা বিন্যাসের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, র‌্যাব, বিজিবি ও অন্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মর্যাদা প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডের। এমনকি ভারতীয় শুল্ক গোয়েন্দা ডিআরআই (ডাইরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স) মহাপরিচালকের পদমর্যাদা এনবিআরের সদস্যের অনুরূপ। কিন্তু বাংলাদেশে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদটি এখনও তৃতীয় গ্রেডেই রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় এ পদটিকে প্রথম গ্রেডে উন্নীতকরণে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর দেশের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে অর্থ আইন ২০১৬ অনুযায়ী শুল্ক সংক্রান্ত যে কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে এ অধিদপ্তরের দায়িত্ব অনেক। অনেকটাই পুলিশের মতো।

আইনে অধিদপ্তরকে ফৌজদারি কার্যবিধি মোতাবেক তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) অনুযায়ী চোরাচালানসহ আরো ৫টি অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রেও শুল্ক গোয়েন্দা ক্ষমতাপ্রাপ্ত। কিন্তু যথোপযুক্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অভাবে এ অধিদপ্তরে অভিযান ও তদন্তের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) হয় তার বেশির ভাগ ঘটে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) ২০১৫ সালে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এভাবে গত তিন দশকে দেশ থেকে অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। এমনকি প্রতি বছর গড়ে দেশ থেকে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এসব অর্থ পাচারের ৮০ ভাগই ঘটছে কথিত বৈদেশিক বাণিজ্যের মোড়কে।

তাই এসব বিচারে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রস্তাবটি খুবই যুক্তিযুক্ত। যা বাস্তবায়ন হলে একটি পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা সংস্থার অনুরূপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। একই সঙ্গে চোরাচালান রোধে দেশজুড়ে আরো বিস্তৃত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান রাইজিংবিডিকে বলেন, দেশ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে হলে শুল্ক গোয়েন্দার সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হলে অর্থ পাচার রোধে শুল্ক গোয়েন্দা দৃশ্যমান সফলতা দেখাতে সক্ষম হবে।

অন্যদিকে নতুন জনবল নিয়োগের বিষয়ে সত্যতা প্রকাশ করে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, শুল্ক গোয়েন্দার প্রস্তাবটি আমরা বিবেচনা করছি। আমরা চাচ্ছি দেশের অন্যান্য গোয়েন্দা ইউনিটের মতো আমাদের গোয়েন্দা বিভাগকে অধিকতর শক্তিশালী করতে। এজন্য তাদের প্রস্তাবগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে কর্মকর্তাদের গ্রেড উন্নয়ন বিবেচনা হচ্ছে না এমন কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালকসহ কয়েকটি পদের গ্রেড উন্নয়নের প্রস্তাব এ মুহূর্তে ওই প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে না। তবে কাজের পরিধি ও কর্মদক্ষতাকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যতে ওই প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। এ মুহূর্তে আমরা শুল্ক গোয়েন্দার ইউনিটে শক্তিশালী করার বিষয়টি বিবেচনা করছি।

এম রহমান

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ অক্টোবর ২০১৬/এম রহমান/ইভা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =